দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আগামী রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) নবম জাতীয় পে স্কেল-২০২৬-এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছে। অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভায় নতুন এই বেতনকাঠামো অনুমোদিত হয়।
নবম পে স্কেলের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী নিম্ন গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীরা। এতে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা (১৪২% বৃদ্ধি) করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা (১০০% বৃদ্ধি)।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর ধরা হলেও বর্ধিত মূল বেতন একবারে দেওয়া হচ্ছে না; চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এটি তিন ধাপে যোগ হবে।
তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
নতুন পে স্কেলের পূর্ণ সুবিধা একবারে পাচ্ছেন না সরকারি চাকরিজীবীরা। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বেসিকের বর্ধিত অংশের ৫০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ২৫ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং বাকি ২৫ শতাংশ তৃতীয় ধাপে যোগ হবে।
অন্যদিকে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি বেসিকের ৪০ শতাংশ প্রথম ধাপে এবং বাকি অংশ ৩০ শতাংশ করে পরবর্তী দুই ধাপে কার্যকর করা হবে।
যেমন, ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকা করা হচ্ছে। ফলে বর্ধিত ১১,৭৫০ টাকার ৫০ শতাংশ (৫,৮৭৫ টাকা) প্রথম ধাপে যুক্ত হয়ে বেসিক দাঁড়াবে ১৪,১২৫ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে আরো ২,৯৩৭ টাকা ৫০ পয়সা যোগ হয়ে বেসিক হবে ১৭,০৬২ টাকা ৫০ পয়সা। অবশিষ্ট ২,৯৩৭ টাকা ৫০ পয়সা তৃতীয় ধাপে যুক্ত হলে মূল বেতন চূড়ান্ত ২০,০০০ টাকায় পৌঁছাবে।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হচ্ছে।
এতে বর্ধিত ৭৮ হাজার টাকার ৪০ শতাংশ (৩১ হাজার ২০০ টাকা) প্রথম ধাপে যোগ হয়ে বেসিক দাঁড়াবে ১ লাখ ৯ হাজার ২০০ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে ২৩ হাজার ৪০০ টাকা যোগ হয়ে হবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা এবং তৃতীয় ধাপে আরো ২৩ হাজার ৪০০ টাকা যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত বেসিক হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। একইভাবে নবম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৪ হাজার টাকা করা হচ্ছে, যা তিন ধাপে যথাক্রমে ৩০ হাজার ৮০০ টাকা, ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৪৪ হাজার টাকায় উন্নীত হবে।
ভাতা চালুর সময়সীমা : নতুন হারে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একসঙ্গে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অপেক্ষার সময় : ২০২৭ সালের জুলাইয়ে শতভাগ নতুন বেসিক কার্যকর হওয়ার পরও নতুন ভাতার পূর্ণ সুবিধার জন্য আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
প্রকৃত আয় : সব ভাতা যোগ হলে কর্মচারীদের মোট মাসিক আয় বেসিকের তুলনায় বেশ বড় অংকে বৃদ্ধি পাবে।
উদাহরণ হিসেবে, ঢাকায় ২০তম গ্রেডে নতুন যোগ দেওয়া একজন কর্মচারীর মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারিত হলে ভাতা যুক্ত হয়ে তার সর্বমোট মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন ভাতা যোগ করে এই মোট পরিমাণ আনুমানিক ৪১ হাজার ৯০৮ টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে; তবে নির্দিষ্ট কর্মস্থল ও প্রযোজ্য ভাতার নিয়ম অনুযায়ী চূড়ান্ত অঙ্কে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে।
অন্যান্য গ্রেডের ক্ষেত্রেও ভাতা যুক্ত হয়ে মোট আয়ে বড় পরিবর্তন আসবে। যেমন—১৩তম গ্রেডে একজন নতুন সহকারী শিক্ষকের ২৪ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে ভাতা যোগ হয়ে মোট আয় হতে পারে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। ১০ম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৩২ হাজার টাকা বেসিকের সঙ্গে ভাতা মিলে মোট প্রাপ্তি ৫০ হাজার টাকা ছাড়াবে। এ ছাড়া নবম গ্রেডের নতুন কর্মকর্তার ৪৪ হাজার টাকা বেসিকের সঙ্গে ঢাকায় ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়াই যুক্ত হবে ২২ হাজার টাকা; পরবর্তীতে চিকিৎসা ও শিক্ষাসহ অন্যান্য ভাতা যোগ হলে তার সর্বমোট মাসিক আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭০ হাজার টাকার কাছাকাছি।Education
তবে বর্তমানে কর্মরত চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন নির্ধারণের হিসাবটি বেশ জটিল। কারণ তাদের বর্তমান মূল বেতন (বেসিক), অর্জিত ইনক্রিমেন্ট, চাকরির মোট মেয়াদ এবং অন্যান্য সুবিধাদি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হবে।
নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে। নতুন কাঠামোর অধীনে বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ সরকারের অতিরিক্ত খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী মিলিয়ে সর্বমোট প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ এই সুবিধা পাবে।
নতুন পে স্কেল ধাপে ধাপে কার্যকর করাকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ। অর্থ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, একবারে পুরো বেতন বৃদ্ধি করলে বাজেটের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতো। ফলে রাজস্ব আয়, বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও সরকারের বাজেট সক্ষমতার কথা মাথায় রেখে তিন ধাপে বাস্তবায়নের এ পথ বেছে নেওয়া হয়েছে, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক মনে করছেন সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ। তিনি জানান, এ প্রক্রিয়ায় নতুন বেতন বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি থাকবে।
রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি জানান, শুধু পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে উন্নয়নমূলক খাতের বাজেট কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই নতুন পে স্কেল কার্যকরের পাশাপাশি দেশে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
