কখন কোথায় আঘাত হানবে ধেয়ে আসা ‘ঘূর্ণিঝড় অর্ণব’?

বঙ্গোপসাগরে তৈরি গভীর নিম্নচাপ ঘিরে ভারতের পূর্ব উপকূলে দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) জানিয়েছে, নিম্নচাপটি এখনো ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ বলা যাচ্ছে না। কারণ এটি এখনো গভীর নিম্নচাপ হিসেবে রয়েছে। উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ উড়িষ্যা উপকূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এটি।

আইএমডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোরের মধ্যে বিশাখাপত্তনম ও গোপালপুরের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে এটি স্থলভাগে প্রবেশ করতে পারে। সম্ভাব্য স্থলভাগে প্রবেশের এলাকা কালিঙ্গপটনমের কাছাকাছি বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

অর্থাৎ, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী সিস্টেমটি স্থলভাগে ঢোকার আগে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই একে এখনই ‘ঘূর্ণিঝড় অর্ণব’ বলা ঠিক নয়। উত্তর ভারত মহাসাগরে কোনো সিস্টেম ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলেই ‘অর্ণব’ নামটি ব্যবহার করা হবে।

কখন ও কোথায় স্থলভাগে ঢুকবে?

গভীর নিম্নচাপটি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে এগিয়ে উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ-দক্ষিণ উড়িষ্যা উপকূল অতিক্রম করবে। সম্ভাব্য এলাকা বিশাখাপত্তনম থেকে গোপালপুরের মধ্যবর্তী উপকূল, বিশেষ করে কালিঙ্গপটনমের আশপাশ।

আইএমডির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ‘ঘূর্ণিঝড়টি’ বুধবার রাতেই উপকূল অতিক্রম করতে পারে। সমুদ্র তখনো উত্তাল থাকবে ও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পশ্চিম-মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে খুবই খারাপ সমুদ্র পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে।

উপকূলের কাছে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫৫-৬৫ কিলোমিটার, দমকা হাওয়ার গতিবেগ আরও বেশি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কোন রাজ্য?

প্রাথমিকভাবে ভারতের উড়িষ্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা। বিশেষ করে, দক্ষিণ উড়িষ্যা ও উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

উড়িষ্যা

দক্ষিণ উড়িষ্যায় ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। কোরাপুট, গজপতি ও গঞ্জামসহ কয়েকটি এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

পরিস্থিতির কারণে রাজ্যের একাধিক জেলায় স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে। খুরদা, জগৎসিংহপুর, গঞ্জাম ও গজপতিতে স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মালকানগিরিতে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রশাসন প্রস্তুতি জোরদার করেছে। কোথাও জরুরি দল মোতায়েন, কোথাও সরকারি কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

অন্ধ্রপ্রদেশ

উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশেও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে, উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ, ইয়ানাম ও রায়ালসীমার বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) থেকে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

শ্রীকাকুলাম ও বিজয়নগরম জেলায় ভারী বৃষ্টির কারণে বুধবার স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে।

অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় এলাকায় অতিবৃষ্টির পাশাপাশি ঝোড়ো হাওয়া ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও রয়েছে। আইএমডি এ কারণে সতর্কতা জারি করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ

সরাসরি স্থলভাগে আঘাতের কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গ নয়। তবে সিস্টেমটির প্রভাবে রাজ্যের উপকূলীয় জেলাগুলোতেও ভারী বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইএমডি শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টি, বজ্রঝড় ও ঝোড়ো আবহাওয়ার সতর্কতা দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের সিস্টেমটির বাইরের ঘূর্ণাবর্ত স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে মিশে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির মাত্রা বাড়াতে পারে।

জেলেদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ

পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্র ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উত্তাল থেকে অতি উত্তাল থাকতে পারে।

এ কারণে উপকূলীয় এলাকায় সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিহারেও পড়বে প্রভাব

স্থলভাগে ঢোকার পর এই ঝড়ের প্রভাব শুধু উপকূলীয় রাজ্যগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিহারেও ২৩ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাত, বজ্রঝড় ও শক্তিশালী বাতাসের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আইএমডির পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতি (২৪ সেপ্টেম্বর) ও শুক্রবার ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি এবং শনি ও রোববার (২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর) ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

তাহলে ‘অর্ণব’ কতটা ভয়ংকর?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘অর্ণব’ নামে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হচ্ছে—এমনটা নিশ্চিত নয়। আবহাওয়া বিভাগ বলছে, বঙ্গোপসাগরের বর্তমান সিস্টেমটি গভীর নিম্নচাপ হিসেবেই উপকূল অতিক্রম করার সম্ভাবনা বেশি।

তবে ঘূর্ণিঝড় না হলেও এর প্রভাব কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভারী থেকে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টি, ঘণ্টায় ৫৫-৬৫ কিলোমিটার বেগের বাতাস, উত্তাল সমুদ্র ও কোথাও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই আপাতত মূল উদ্বেগ ‘অর্ণব’ নামটি নয়; বরং বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত উড়িষ্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশে ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও সমুদ্রের উত্তাল পরিস্থিতি।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *