আর কত দিন লাগবে পে স্কেলের গেজেট প্রকাশে, যা জানালেন কর্মকর্তারা

মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন এখনো জারি হয়নি। অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনার কথা জানানো হলেও, প্রজ্ঞাপনের খসড়াই এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়নি। খসড়াটি বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দীর্ঘ ১০ বছর পর নতুন পে স্কেল অনুমোদন হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সাবেক আমলারা বলছেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারির আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। ফলে কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক।

গত ৩১ আগস্ট সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হতে পারে। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তা হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোর সারাংশ আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। আগামী বুধবারের মধ্যে ভেটিং সম্পন্ন করা গেলে চলতি মাসেই গেজেট প্রকাশ হতে পারে। তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হলে সময় পিছিয়ে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নবম পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের জন্য ১৭, ২১ অথবা ২২ সেপ্টেম্বর—এ তিনটি সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়ার পরই চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পে স্কেলের গেজেট জারির দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে একাধিক সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন হওয়ার পর গেজেট জারির তারিখ নির্ধারণ করা হবে।’

আইন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, এখনো পে স্কেলের খসড়া তাদের কাছে পৌঁছায়নি। গত রোববার বিকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমরা শুনেছিলাম, দুই এক দিনের মধ্যেই অনুমোদিত পে স্কেলের খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য আমাদের কাছে পাঠানো হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটি আমাদের হাতে আসেনি।’

সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি অনেক সময় মাসও লেগে যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন পর নতুন পে স্কেল ঘোষণা হওয়ায় এবার মানুষের প্রত্যাশা বেশি থাকায় হতাশাও তৈরি হয়েছে।

সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য যে খসড়া পাঠানো হয়, সেখানে মূলত কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন ভাতা বাড়ানো হবে, তার সামগ্রিক প্রস্তাব থাকে। কিন্তু অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া তৈরি করতে হয়। সেখানে কর্মকর্তা কর্মচারীদের কোন শ্রেণিতে কীভাবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হবে, তার বিস্তারিত নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়।

তিনি বলেন, জনপ্রশাসনের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কার্যকর হবে, সেটিও প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করতে হয়। আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকলে এসব কাজ শেষ করতে সময় লাগতে পারে।

প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। সেখানে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর সঙ্গে সংবিধান, চাকরি সংক্রান্ত আইন বা বিধির কোনো বিরোধ আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি প্রজ্ঞাপনে ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য ও আইনি পরিভাষায় কোনো অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থবোধকতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হয়।

এ ছাড়া নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বিধিমালা বা সংবিধিবদ্ধ আদেশের খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়। এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা চূড়ান্ত খসড়া মুদ্রণের জন্য সরকারি মুদ্রণালয় বিজি প্রেসে পাঠান। মুদ্রণ শেষে তা সংগ্রহ করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রিসভার অনুমোদনের দুই সপ্তাহ পরও খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে না যাওয়ার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা আসলে আটকে রাখার বিষয় নয়। গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন, সেগুলো মেনেই কাজ করতে একটু সময় লাগছে।’

তিনি জানান, সামরিক বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির কাজও চলছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘দ্রুতই ভেটিংয়ের জন্য এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।’

উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় পে স্কেল মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এরপর প্রায় সাড়ে তিন মাস পর ১৫ ডিসেম্বর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *